কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক রাজনীতি, আদর্শিক অবস্থান ও আকিদাগত বিতর্ককে কেন্দ্র করে প্রকাশিত একটি বই ঘিরে ইসলামি অঙ্গনে তৈরি হয়েছে আলোচনা ও কৌতূহল। শাকের হোসাইন শিবলী সম্পাদিত ‘ফেতনায়ে মানুনিয়্যা ও মাওলানা আবদুল হক আজাদের সিংহ গর্জন’ শীর্ষক বইটির নাম ও প্রচ্ছদ পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বইটিতে কী বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, কোন প্রেক্ষাপটে এর বিষয়বস্তু সংকলিত হয়েছে এবং সমসাময়িক কওমি রাজনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্ন ঘিরেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে বইয়ের নাম ও প্রচ্ছদ বইটির প্রচ্ছদে দারুল উলুম দেওবন্দের একটি স্থাপনার ছবি এবং আগুনের আবহে নখরসদৃশ একটি চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে। শিরোনামে রয়েছে ‘ফেতনায়ে মানুনিয়্যা’ এবং ‘মাওলানা আবদুল হক আজাদের সিংহ গর্জন’—দুটি পৃথক বিষয়বস্তু। এমন নামকরণ ও প্রচ্ছদ বইটি সম্পর্কে পাঠকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে। প্রদত্ত বিবরণ অনুযায়ী, সিলেটের শিক্ষক মাওলানা আতাউল হক জালালাবাদীর সঙ্গে একটি কথোপকথনে কওমি অঙ্গনে জামায়াত-শিবিরের প্রভাব এবং মাওলানা মামুনুল হকের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে ‘ফেতনায়ে মানুনিয়্যা’ শব্দবন্ধটি সামনে আসে। তবে এ নামকরণের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট বুঝতে সংশ্লিষ্ট কথোপকথন ও বইয়ের মূল বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মাওলানা আবদুল হক আজাদের বক্তব্যকে ঘিরে সংকলন বইটির অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বগুড়ার শহীদ টিটু মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে প্রবীণ আলেম মাওলানা আবদুল হক আজাদের দেওয়া বক্তব্যকে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন বগুড়া জামিল মাদরাসায় হাদিস ও তাফসিরের দরস দিয়েছেন। বক্তৃতায় কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা, দেওবন্দি উসূল ও আদর্শিক অবস্থান রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সমালোচনা করা হয়েছে বলে বই-সম্পর্কিত বিবরণে দাবি করা হয়েছে। বিশেষভাবে কওমি অঙ্গনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট, আদর্শিক অবস্থান এবং আকিদাগত আপসের প্রশ্নগুলো আলোচনায় এসেছে বলে জানা যায়। এসব বক্তব্যের যথার্থতা, পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান মূল্যায়নের জন্য মূল বক্তৃতা কিংবা বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশ দেখা জরুরি।
শীর্ষ আলেমদের বক্তব্যও রয়েছে বলে দাবি বইটির প্রকাশনা-সংক্রান্ত বিবরণে বলা হয়েছে, এতে কওমি অঙ্গনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্ক নিয়ে কয়েকজন আলেমের বক্তব্য সংকলিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মুফতি লুৎফর রহমান ফরায়েজী ও মুফতি নোমান কাসেমীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)-এর স্মারকপত্র ও পূর্ববর্তী সতর্কবার্তাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বইটি ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে ঈমান-আকিদা সংরক্ষণ কমিটির উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর শুভেচ্ছামূল্য ৫০ টাকা—এমন তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রকাশক, প্রকাশকাল, মূল্য ও বইয়ের ভেতরে সংকলিত বক্তব্যের বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কওমি রাজনীতির বিতর্কে নতুন মাত্রা? বাংলাদেশের কওমি অঙ্গনে ধর্মীয় আদর্শ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা মত ও বিতর্ক রয়েছে। এ ধরনের বিষয় নিয়ে প্রকাশিত বই একদিকে ঐতিহাসিক বক্তব্য ও মতামত সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনের অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে। শাকের হোসাইন শিবলীর সম্পাদনায় প্রকাশিত বইটি সেই বৃহত্তর বিতর্কের কোন দিকগুলো সামনে এনেছে, তা নির্ধারণে বইটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত মাওলানা মামুনুল হককে ঘিরে উত্থাপিত বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট আলেমদের মূল বক্তব্য এবং যাঁদের সমালোচনা করা হয়েছে তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানা গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
তবে এটি নিয়ে তরুন আলেমরা ব্যাপক সমালোচনা ও নিন্দা করছেন। আবার মামুনুল হকের বিরোধীরা বইটিকে সামনে নিয়ে আসতে কাজ করছেন। সব মিলিয়ে, বইটির শিরোনাম ও বিষয়বস্তু কওমি অঙ্গনের সমসাময়িক আদর্শিক বিতর্কের প্রতি নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে আলোচনার প্রকৃত ব্যাপ্তি, বইটির বক্তব্যের যথার্থতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের পরই এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব। বইটি আজ সকাল থেকে ইসলামি অঙ্গনে টক অব দ্যা কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। যানা যায় বইটির প্রথম সংস্করণ আজ দুপুরের আগেই কয়েক ঘন্টায় শেষ হয়ে যায়।